অ্যাকশনঃ পেঁয়াজু-বেগুনী ও একজন সৌভাগ্যবান আমি (দিন ১৫)

প্রথম তারাবী নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে তখনও বের হতে পারিনি, পকেট এ রাখা মোবাইলটা ভাইব্রেট করে উঠল। মিঠু ভাই এর ফোন, ‘হ্যাঁ ভাইয়া আজকে আসোনি কেন মিটিং এ?’ ‘ভাইয়া আমার তো ক্লাস ছিল তাই যেতে পারিনি।‘ ‘আচ্ছা সমস্যা নেই বল তুমি কবে কাজ করবে?’ ‘আসলে সপ্তাহে ৬ দিন করে ক্লাস, কবে যে করতে পারব বুঝতে পারছিনা।’ ‘এক কাজ কর ১৯ তারিখ শুক্রবার আছে, সেদিন পান্থপথ এর এরিয়া লিডার তুমি।‘ কিছু বুঝে ওঠার আগেই এরিয়া লিডার! বাপরে, বিশাল দায়িত্ব! তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল ধুর! কেন যে ফেসবুক অ্যাকশনিয়ার গ্রুপ এ কমেন্টটা করতে গিয়েছিলাম যে কাজ করব! কিন্তু কেন যেন না করতে পারলাম না, বললাম ‘ঠিক আছে ভাইয়া।‘ তারপর আমার কি করতে হবে সব বুঝিয়ে দিলেন মিঠু ভাই। এর আগে ‘অ্যাকশনঃ পেঁয়াজু-বেগুনী তে কখনও কাজ করিনি, তাই বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। ১০ তারিখ এর পর থেকে শুরু হয়ে গেল আমার ডোনেশন এবং অ্যাকশনিয়ার অন্বেষণ! কিন্তু আশানুরূপ সাড়া পেলাম না। এদিকে ক্লাস পুরোদমে চলতে থাকায় কিছু জায়গায় যেতে পারিনি ডোনেশন আনার জন্য। দেখতে দেখতে ১৫ তারিখ পেরিয়ে গেল, না অ্যাকশনিয়ার, না ডোনেশন কোন কিছুতেই সুবিধা করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, নাহ! এই দায়িত্বটা নেয়া ঠিক হয়নি, অন্য কেউ নিলে হয়ত আরও অনেক ভালভাবে ব্যাপারগুলো ম্যানেজ করতে পারত। পান্থপথ এর মত এলাকায় ১৭ তারিখ পর্যন্ত অ্যাকশনিয়ার পেয়েছিলাম ৮ জন, আর ফান্ড? সেকথা নাই বা বললাম। একটা হতাশা কাজ করছিল নিজের মধ্যে। কিন্তু তা স্থায়ী হবার আগেই আমাকে অবাক করে দিয়ে একদিনের মধ্যে আরও ৮ জন অ্যাকশনিয়ার হাজির! আর সেই সাথে ফান্ডও প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি! আল্লাহ্‌র কাছে শুকরিয়া জানিয়ে শুরু করে দিলাম খরচ-পাতির হিসাব-নিকাশ। কতগুলো প্যাকেট করব, কি কি আইটেম থাকবে ইত্যাদি।

অবশেষে চলে আসল প্রতীক্ষিত ১৯ তারিখ। সকাল ১০ টার দিকে কারওয়ান বাজার গেলাম। ৫ জন ছিলাম আমরা- আমি, সাইফুল, তাহমিদ, অক্ষর আর আকাশ। একে একে জুস, বিস্কুট, খেজুর, ব্যাগ ইত্যাদি কেনা হল। যত বিপত্তি বাঁধল কলা কিনতে গিয়ে। সেদিন কারওয়ান বাজার কলার আড়তে কোন পাকা কলা নেই! কি করা যায়? ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকেই কিনতে হল। এর কাছ থেকে একশ, ওর কাছ থেকে একশ, এমন করে। কেনাকাটা শেষ হল, এবার এগুলো বাসায় কিভাবে আনবো? আমাদের সাথে কোন গাড়ি ছিল না। সিএনজি অটোরিকশা তে এত কিছু জায়গা হবে না, আর ভি আই পি রোড হওয়ায় রিকশা/ভ্যান ও সরাসরি যেতে পারবে না। তবে এক ভ্যানওয়ালা বলল,‘আরে মামা সার্জেন এর হাতে পাছ ট্যাহা ধরায়ে দিয়েন। যাইতে দিব।’উপায় দুটো- হয় ট্রাফিক সার্জেন্ট কে ঘুষ দিয়ে ভ্যান নিয়ে রাস্তা পেরোতে হবে, অথবা জিনিসপত্র হাতে নিয়ে হেঁটে রাস্তা পাড়ি দিয়ে রিকশা নিতে হবে। এতগুলো ভারী জিনিস নিয়ে হেঁটে যাওয়া খুব সহজ নয়। কিন্তু আমরা ভাবলাম একটা ভালকাজ করতে গিয়ে যদি ওদিকে ঘুষ দিতে হয়, তাহলে এই কাজের আর সম্মান থাকল কই? অগত্যা দ্বিতীয় উপায়-ই বেছে নিতে হল। হাতে প্রায় ১০ কেজি ওজনের দুটো জুস এর কারটন নিয়ে যখন কারওয়ান বাজার আন্ডার-পাস দিয়ে যাচ্ছি মনে হচ্ছিল হাতদুটো বুঝি এখনি খুলে পড়ে যাবে। ভাবলাম, নিজের জন্য হলে তো কোনভাবেই এই কাজ করতাম না! তার ওপর আবার রোজা! অ্যাকশনঃ পেঁয়াজু-বেগুনী অনেক কিছুই শিখাল বটে। যাই হোক, অবশেষ সবকিছু নিয়ে বাসায় আসলাম। এবার টাকা পয়সার হিসাব করতে গিয়ে দেখি অনেক টাকা বেচে গেছে! কি করা যায়? জুমার নামাজ পড়ে আকাশকে নিয়ে আবার গেলাম কারওয়ান বাজার। বাচ্চাদের জন্য কেক কিনে আনলাম।

তিনটার দিকে একে একে বাকি অ্যাকশনিয়াররা আমার বাসায় আসা শুরু করল। বাসার পাশের হোটেল-এ অর্ডার দিয়ে রাখা পেঁয়াজু-বেগুনীআর আলুর চপ নিয়ে আসলাম আর শুরু করে দিলাম প্যাকিং। মোট ২৫০ টি প্যাকেট করতে সময় লাগল দুঘণ্টার মত।

 

প্যাকিং শেষে আসরের নামাজ পড়ে বেরিয়ে গেলাম আমরা। চারটা দলে ভাগ হয়ে বিতরণ করব চিন্তা করলাম। পান্থপথ সিগনাল থেকে চারটা দল চারদিকে চলে গেল- হৃদয়, তাহমিন, ফয়সাল আর ইভান গেল গ্রীন রোড এর দিকে। ওয়াসিও ভাই, সাদাব ভাই, আরজু ভাই আর সাইফুল কাভার করল বসুন্ধরা সিটির দিকটা। কলাবাগান এর দিকে পাঠালাম অক্ষর, আকাশ, পিয়া আর ফাহাদ ভাই কে। ফার্মগেট এর দিকটা বেছে নিলাম আমি, আব্দুল্লাহ ভাই, অলি আর নাহিয়ান।  আমরা গেলাম আইবিএ হোস্টেল এর পেছনের দিকের একটা বস্তিতে। স্থানীয় লোকজনের পরামর্শে মসজিদের পাশে বাচ্চাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া শুরু করলাম। আমাদের সাথে থাকা আশিটা প্যাকেট মোটেও পর্যাপ্ত ছিলনা। তাই, যাদের কে দিতে পারিনি তাদের কাছে ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার ছিলনা আমাদের। খুব খারাপ লাগছিল এতগুলো বাচ্চাকে খালি হাতে ফেরত পাঠিয়ে। কিন্তু আবার এটাও চিন্তা করলাম, আমরা তো কাউকে খাওয়াইনি। রিযিকের মালিক তো একমাত্র আল্লাহ। যাদের রিযিক ছিল, আমরা শুধু তাদের কাছে সেটা পৌঁছে দিয়েছি। একটা মাধ্যম হিসেবে কাজ করেছি কেবল। তবে হ্যাঁ, এক-এক টি প্যাকেট পেয়ে সেই বাচ্চাগুলোর যে হাসিভরা মুখ আমরা দেখেছি সেটাই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় উপহার।

কমিউনিটি অ্যাকশন এর প্রতি আমি কৃতজ্ঞ এমন একটা উপহার দেওয়ার জন্য। আর যারা আমাদের এই কাজে ডোনেশন দিয়ে সাহায্য করেছেন, তাদের আসলে ধন্যবাদ দেওয়ার কিছু নেই, আল্লাহ্‌-ই তাদের উত্তম প্রতিদান দান করবেন। আর আমার অ্যাকশনিয়ার গ্রুপ? একথা হলফ করে বলতে পারি, সবার মধ্যে আমি-ই ছিলাম সবচেয়ে আনাড়ি। সবার উৎসাহ দেখে আমি অভিভূত হয়েছি। এমন একটি গ্রুপ এর সাথে কাজ করতে পারা সত্যি-ই ভাগ্যের ব্যাপার।

হ্যাঁ, আমি সৌভাগ্যবান।

This entry was posted in Action: Piyaju-Beguni, CommunityAction. Bookmark the permalink.

12 Responses to অ্যাকশনঃ পেঁয়াজু-বেগুনী ও একজন সৌভাগ্যবান আমি (দিন ১৫)

  1. Rashed says:

    jottil hoise….. lammbu” hridoy” kono kaj korse?? ore beshi beshi khataben…. & i will feel proud if you join me with you….. i want to work with you……. beshi na pari, kichu korte parlei valo lagbe……..

  2. Al Nahian says:

    Bah!
    shundor lekhar darun procheshta!!
    (kaj shomporke noy, ami nahoy kebol shahitto-man niei boli?)
    amar kache valo legeche. . .
    tobe amon akta dine “ONNO” desher jatio potaka na porle ki hotona?

  3. hasan tarek akash says:

    Sufian vaiya… 1st time holeo… your words were absolutely heart touching… :) same feelings amar chilo last year……. action leader der moddhe ami chilam junior… r amar area te 1 jon o member chilo na,,jara CA te kaj kore… tar upor jokhon shunsi j fund o amake collect korte hobe,, tokhon mone hoise hay ALLAH ei ki bipod!!! ami kothay pabo ato tk!!!! or,, k e ba amake ato boro kaaj e help korbe?? bt,, by the grace of almighty, I was suuccessful to manage both my school nd college frnds. bt,, making my frnds understood what is CA,, why this runs for ,, was the toughest part than the main event. It took a hard preparation for me introducing CA to my frnds. Some took time to realize it,, and some refused me. bt,, at last,, ALLAH made us successful!! and,, now many of them are active(SORRY IF UM WRONG) member of CA. :) :)

    • hasan tarek akash says:

      Sufian vaiya… 1st time holeo… your words were absolutely heart touching… :) same feelings amar chilo last year……. action leader der moddhe ami chilam junior… r amar area te 1 jon o member chilo na,,jara CA te kaj kore… tar upor jokhon shunsi j fund o amake collect korte hobe,, tokhon mone hoise hay ALLAH ei ki bipod!!! ami kothay pabo ato tk!!!! or,, k e ba amake ato boro kaaj e help korbe?? bt,, by the grace of almighty, I was suuccessful to manage both my school nd college frnds. bt,, making my frnds understood what is CA,, why this runs for ,, was the toughest part than the main event. It took a hard preparation for me introducing CA to my frnds. Some took time to realize it,, and some refused me. bt,, at last,, ALLAH made us successful!! and,, now many of them are active(SORRY IF UM WRONG) member of CA. :) :)

  4. আমি says:

    ছোট ছোট ছেলে মেয়ে গুলো কাজ ও করে, লিখে … আবার কাজ করে… মাশাল্লাহ :)

  5. Sufian says:

    @Rashed bhai: Thanx for ur interest bro…shamne aro onek jaak ashbe,,tokhon help korben asha kori :)

    @Nahian: ONNO desher jatio potaka na porle nishchoi hoito,,,infact,,na poratai uchit chilo hoito….kintu i was so preoccupied with other works j nijer dress-up niye chinta korar tym pai nai..r shahittomaan jachai korar jonno dhnnobad :)

    @Akash: toder r ki bolbo vai,,,tora 3ta bondhu onek khatsish…nahole kaajgula kora onek kothin hoe jeto

    @Sohailapu: tai bole ekdom choto na!! :P
    And thanx apu,,that means a lot :)

  6. Soieb Reza says:

    Bro…apnader sathe kaaj korte chai??
    Ami ki korte parbo???
    Jodi pari tobe kivabe abong kothai???
    plz janaben. . . :)

  7. Ananya says:

    dst tui khub shundor kore blog likhis……. very neat indeed….. tui to besh shudho kore kotha lokhte janis….:P i wasn’t bored at all to read it…….. :D n what u did was awesome….i wish i had the chance to join u guys….. :( next tym inform me coz um really interested to do this type of great things…… :D

  8. Sufian says:

    @Soieb Reza: Sure
    keep ur eyes on the website or the fb page https://www.facebook.com/#!/communityactionbd

    @Ananya: Thanks dost…ami nijeo obaak j ami to besh shuddho likhte jani :P
    and InshaAllah will let u know next time i do sth :)

  9. DollaR says:

    Sufian: khub e sundor likheso, r kaj o dekhiyeso besh valo :)

  10. Tembok says:

    That’s the best awsner of all time! JMHO

Leave a Reply to Rashed Cancel reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *