একটি ডাক…অভাবনীয় সাড়া, জয়তু তারুণ্য, জয়তু বন্ধুত্ব!!!– অ্যাকশনঃপেঁয়াজু-বেগুনী ২০১১ (দিন ২২)

২৬শে আগস্ট খিলগাঁও-রামপুরা এলাকায় অ্যাকশনঃ পেঁয়াজু-বেগুনী করতে গিয়ে বন্ধুত্ব এবং তারুণ্যের শক্তি নতুন করে প্রমাণিত হল। কে বলে আমরা কিছু পারি না??? পারব না??? আমরা পেরেছি!!! :D

এবার অ্যাকশনঃপেঁয়াজু-বেগুনী ২০১১ শুরুর আগে অ্যাকশন লিডার মিঠু ভাই-এর বাসায় যেদিন প্রথম মিটিং হলো সেদিন থেকেই অপেক্ষার পালা শুরু, কবে রামপুরা তে আমরা অ্যাকশনটি করব! এবার যেহেতু রামপু্রাতে প্রথম বারের মতো এই অ্যাকশনটি করা হচ্ছে তাই প্রথম থেকেই ইচ্ছা ছিল এটা যেন একটু ভালো করে করা যায়। এর পর জানতে পারলাম খিলগাঁও এলাকাও রামপুরা-র সাথে যুক্ত করা হয়েছে। তখন মনের ভিতরের ইচ্ছাটা আরও জোরালো হলো কারণ এই দুই এলাকায় অনেক দরিদ্র মানুষের বসবাস এবং ছোট বাচ্চার সংখ্যাও অনেক বেশি।

এরপর শুরু হল প্রস্তুতির পালা। প্রথমেই ফান্ড তোলার কাজ। ভেবেছিলাম অনেক কঠিন হবে, কিন্তু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবার কাছ থেকে এতো ভাল সাড়া পেলাম যে আমরা নিজেরাই অবাক হয়ে গিয়েছি! সবাই যেন দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে ছিলো,চাইতেই তারা রাজি হয়ে গেল সাহায্য করার জন্য! তাদের এই উদার হস্তে দানের কল্যাণে যতোটা না আমাদের লক্ষ্য ছিল তার চেয়ে বেশি ইফতার প্যাকেট করার মত টাকা আমাদের হাতে চলে এলো। এর পর আমরা হিসাব করে দেখলাম যে CA-র কমন ফান্ড এ ২০% দেওয়ার পরও এই টাকা দিয়ে আমরা প্রায় ৯৫০টি প্যাকেট করতে পারব। এখন ঠিক করার পালা, খাবার কি কি দেওয়া হবে? খিলগাঁও-এ এরিয়া লিডার শৈশব ভাই একটি মিটিং ডাকলেন অ্যাকশনিয়ার দের নিয়ে। অনেক জনের অনেক মত শোনার পর ঠিক করা হল আমাদের আইটেম হবে পেঁয়াজু, বেগুনী, আলুর চপ, কলা, কেক, বিস্কুট, জুস, চকলেট। ডিম দেওয়ার খুব ইচ্ছা ছিল কিন্তু ৯৫০টি ডিম সিদ্ধ করব কোথায়? এই ভয়ে ডিমটা লিস্ট থেকে বাদ দিলাম। যদিও শৈশব ভাই এর আইডিয়া ছিল আমরা ডিমগুলো কারও বাসার পানির ট্যাংক এ ছেড়ে দিয়ে ট্যাংক এর নিচে আগুন জ্বেলে দিলেই তো ডিম সিদ্ধ হয়ে যাবে!! ভবিষ্যতে কোনও দিন এই বুদ্ধি হয়তো আমরা ট্রাই করে দেখব…হা হা হা!

এবার আইটেম তো ঠিকহল কিন্তু এগুলো কেনা হবে কোথা থেকে? ঠিক হল কলা,জুস,চকলেট আর বিস্কুট কারওয়ান বাজার থেকে কেনা হবে। কেক আমরা বেকারি থেকে অর্ডার দিয়ে বানিয়ে আনব। কেনাকাটায় অ্যাকশনিয়ার তাহমিদ ভাই খুব সাহায্য করেছেন আর বেকারি তে কেক অর্ডার দেওয়া এবং সেগুলো আনার কাজে সাহায্য করেছে বন্ধু তামিম যে কিনা এই প্রথম বারের মত অ্যাকশনঃ পেঁয়াজু-বেগুনী তে কাজ করলো। আর বাকি থাকে পেঁয়াজু-বেগুনী-আলুর চপ। ঠিক হল এগুলো কাছাকাছি কোথাও থেকে কেনা হবে।

কিন্তু ৯৫০ প্যাকেট ইফতার বিতরণ করার জন্য যতজন অ্যাকশনিয়ার দরকার তা তো আমাদের নেই! খিলগাঁও এবং রামপুরা মিলিয়ে ২৫ জনের মতো অ্যাকশনিয়ার মাত্র! তাদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই মেয়ে। অ্যাকশন লিডার মিঠু ভাই এই খবর পেয়ে আমাদের ৯৫০ প্যাকেট করার আইডিয়া মাথা থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। কিন্তু আমাদের কেন যেন মনে হচ্ছিল আমরা পারব! তাই আমরা অনেকটা মিঠু ভাইয়ের অমতেই ৯৫০প্যাকেট করার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। এবং আসলেও আমরা পেরেছি!

ভূত থেকে ভূতে(!) এই পদ্ধতিতে কাজ শুরু হল। বন্ধুদের বলার সাথে সাথে তারা কাজ করতে রাজি হয়ে গেল এবং তারা তাদের বন্ধুদেরকেও রাজি করিয়ে ফেলল। এভাবে মাত্র একদিনেই শুধুমাত্র রামপুরাতেই ৪০জন অ্যাকশনিয়ারের একটি টিম হয়ে গেল! এবং খিলগাঁও এর টিম মিলিয়ে ভলান্টিইয়ারেরর সংখ্যা হয়ে দাঁড়ালো ৫৫জন!! যদিও ভয় ছিল এরা সবাই হয়ত অ্যাকশন এর দিন নাও আসতে পারে। কিন্তু তারপরও বন্ধুদের উপর ভরসা ছিল এবং আশা ছিল অন্তত ৪০ জন তো আসবেই। তাতেই আমাদের হয়ে যাবে।

এবার আর ৯৫০প্যাকেট করায় কোন বাধা নেই…। এমনকি এতগুলো প্যাকেট করতে যে বিশাল জায়গার দরকার সেটারও ব্যবস্থা হয়ে গেল বন্ধু যুথি এবং জারিন এর কল্যাণে।

অ্যাকশন এর আগের দিন রামপুরায় অ্যাকশনিয়ারদের নিয়ে একটি মিটিং ডাকা হল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল শেষ বারের মত সবার ব্যক্তিগত ফান্ড এক সাথে করা এবং পরের দিন আমরা কয়টি স্পট এ খাবার বিতরণ করব সেটা নির্ধারণ করা। ঠিক হল রামপুরায় আমরা ৪টি স্পট এ ৫০০প্যাকেট খাবার দিব এবং খিলগাঁও এ ২টি স্পট এ ৪৫০প্যাকেট খাবার দেওয়া হবে। মিটিং এ অনেক নতুন অ্যাকশনিয়ার এর সাথে পরিচয় হল। তাদের মাঝে একজন হচ্ছেন তৌফিক ভাই। যিনি স্বেচ্ছায় রামপুরার অ্যাকশন এর জন্য ৫০০টি করে পেঁয়াজু-বেগুনি-আলুর চপ কিনে আনার দায়িত্ব কাঁধে নেন। এই মিটিং এই ঠিক করা হয়েছিল যে পরদিন যদি বৃষ্টি হয় তাহলে দূরের স্পটগুলো তে আমরা ভ্যান দিয়ে খাবার নিয়ে যাব। এবং ভ্যান এর জন্য আমরা একজন স্পন্সরও পেয়ে গেলাম, ইয়াদ ভাই! খিলগাঁও এ একটি গাড়িও থাকবে।

পরদিন মহাযজ্ঞ! কিন্তু সেদিন ছিল আবার ‘জুম-আ-তুল বিদা’, ছেলেরা মসজিদ থেকে নামাজ পরে সবাই এসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বেজে গেল দুইটা ত্রিশ! এবং আমি অবাক হয়ে খেয়াল করলাম রামপুরায় ৪০ জন আসার কথা থাকলেও এসেছে ৪৮ জন! তার মানে সব মিলিয়ে আমাদের ৬৩জন ভলান্টিয়ার! এত মানুষ!! মানুষের প্রতি মানুষে এত ভালবাসা!! এরা তো ‘কমিউনিটিঅ্যাকশনবা ‘অ্যাকশনঃপেঁয়াজু-বেগুনী’ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানে না! ভেবেছিলাম এত নতুন মানুষ নিয়ে প্যাকিং এর কাজ শেষ করতে অনেক সময় চলে যাবে, কিন্তু না! অ্যাকশনিয়াররা সবাই মিলে খুব সিস্টেমেটিক ভাবে মাত্র ১ ঘন্টায় কাজ শেষ করে ফেললো। তাদের এই উদ্যমী মনোভাব যেন আমাদের সবার মাঝে সঞ্চারিত হয়ে গেল।

এরপর ৪টার দিকে খাবার এর প্যাকেট নিয়ে রওনা হয়ে গেল সবাই। স্পটে পৌঁছানোর পর সে যে কি অবস্থা! প্রায় সব টিম এই একই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছে যে, “আপনেরা কোন দল থিকা আইছেন?” তাদের প্রশ্নের জবাবে আমাদের মুচকি হাসি ছাড়া উপায় ছিল না।

রামপুরার ৪টি স্পটে পাঁচটা-সোয়া পাঁচটার ভিতর কাজ শেষ। খিলগাঁও এর কাজও সাড়ে পাঁচটার মধ্যে  শেষ। এতগুলো প্যাকেট যে এত দ্রুত শেষ হয়ে যাবে সেটা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না! প্রথমে যেখানে মনে হয়েছিল যে ৯৫০ প্যাকেটই অনেক বেশি সেখানে পরে মনে হয়েছে এখানে যদি আমরা আরও ৯৫০ প্যাকেট করতে পারতাম তাহলেও হয়তো কম হয়ে যেত। কয়েকটি স্পট এ অ্যাকশনিয়ারদের কে নাকি পিচ্চি বাহিনীর তাড়াও খেতে হয়েছে!

সারা দিনের এত কষ্ট তার উপর স্পট এ তাড়া খেয়েও আমাদের নতুন অ্যাকশনিয়ারদের উপলব্ধি হল, “কাজটি খুব-ই আনন্দের!” ছোট ছোট বাচ্চাদের নিষ্পাপ হাসি আমাদের ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজে যোগদান করার প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। যদিও একই সাথে চাহিদার তুলনায় প্যাকেট যথেষ্ট না থাকার কারণে কিছু বাচ্চাকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে হয়েছে বলে অ্যাকশনিয়াদের অনেকেরই বেশ মন খারাপ হয়েছিল কিন্তু যেটুকু করতে পেরেছি তাতেই আমরা আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি এবং যাদের হাতে খাবার তুলে দিতে পেরেছি তাদের অমূল্য হাসিটুকুই আমাদের এই অ্যাকশনের সাফল্য হিসাবে ধরে নিচ্ছি। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে আমরা আরও বড় আকারে এখানে অ্যাকশনঃপেঁয়াজু-বেগুনী করার চেষ্টা করব। নতুনদের মধ্যে অনেকেই জানিয়েছে, তাদের সবসময়ই ইচ্ছা ছিল এ ধরনের কিছু করার। কিন্তু করার মত উপযুক্ত প্লাটফর্ম পাচ্ছিল না। তাই ভবিষ্যতেও এ ধরনের কাজে আমাদের সাথে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলো অনেকেই।

এটাই তো চাই…!!! পরিশেষে ধন্যবাদ জানাই সেই বন্ধুদের(সজীব,অমিত,হিমেল,মামুন…) যারা একদিনের মাঝে এত ভলান্টিয়ার যোগাড় করে দিয়েছে। তাদের কাছ থেকে এই অভাবনীয় সাড়া না পেলে হয়ত কাজটা আমারা এত ভালভাবে শেষ করতে পারতাম না। ধন্যবাদ ৬৩ জন অ্যাকশনীয়ারকে। এবং সর্বোপরি ধন্যবাদ জানাই শৈশব ভাইকে যার সার্বিক সহযোগিতা ছাড়া এই কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা বলতে গেলে অসম্ভব ছিল এবং বন্ধু তাপসী-কে তার সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য।

এখানে এসে ফিরে যেতে হয় সেই প্রথম লাইন এ… জয়তু তারুণ্য, জয়তু বন্ধুত্ব !!!

This entry was posted in Action: Piyaju-Beguni, CommunityAction. Bookmark the permalink.

3 Responses to একটি ডাক…অভাবনীয় সাড়া, জয়তু তারুণ্য, জয়তু বন্ধুত্ব!!!– অ্যাকশনঃপেঁয়াজু-বেগুনী ২০১১ (দিন ২২)

  1. শৈশব says:

    এই ভালোলাগার সাথে আর কোন কিছুরই তুলনা হয় না……হঠাৎ করে মনে হলো কিছু একটা করে ফেলেছি……ধন্যবাদ সিএ কে! :D

  2. Ashique Khan says:

    Alhumdulillah! May Allah sustain this smile on their faces. May Allah reward the enlightened and beautiful people who made them smile. May Allah grant His mercy on them in both lives.

  3. Tamal Towhid says:

    শারীরিক ভাবে উপস্থিত থেকে হয়তো এইবার পারিনাই। তবে আগামিবার এইবারের চেয়ে আরও বেশি contribute করার ইচ্ছা আছে। শারীরিক ভাবে উপস্থিত থেকে সম্ভব না হলেও আর্থিকভাবে করবো। ইনশাল্লাহ……….

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *