ছোট ছোট হাত, ছোট ছোট স্বপ্ন…

কমিউনিটি অ্যাকশনের সাথে আমার পথচলা খুবই অল্পদিনের; মাত্র এই রমজানেই ‘অ্যাকশনঃ পিঁয়াজু-বেগুনি’তে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে আমার অ্যাকশনিয়ার-জীবনের শুরু। যেহেতু সিলেটে থাকি এবং সিলেটে কমিউনিটি অ্যাকশনের কার্যক্রম তুলনামূলক কম, তাই অনেকদিন ধরে এটার প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ঠিক সুযোগ হয়ে উঠছিল না।কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, আমার মেডিকেল কলেজের বন্ধু এবং সিরিয়াস অ্যাকশনিয়ার তানজিয়া তামান্না নিটোলের কল্যাণে এবার সিলেটে আমরা প্রথমবার ‘অ্যাকশনঃ পিঁয়াজু-বেগুনি’ সফলভাবে আয়োজন করতে সক্ষম হই। এর কিছুদিন পরই একদিন সেহরির পর ফেসবুকে জানতে পারি ‘অ্যাকশনঃ মেহেদি ম্যাজিক’ এর কথা। পড়তে পড়তেই মাথায় চট করে আইডিয়াটা খেলে যায় – এটা তো সিলেটেও করতে পারি, কাজটা তো খুব একটা কঠিন না। ব্যস! তৎক্ষণাৎই ভাবা শুরু করে দিলাম কীভাবে কী করবো, কাদের কাদের বলবো… উত্তেজনায় আর সেহরির পর ঘুমাতেই পারলাম না! এমনকি অনেকক্ষণ পর যখন চোখ লাগল, মেহেদি ম্যাজিক নিয়ে একটা স্বপ্নও দেখে ফেললাম! :D

সকালে অ্যাকশন লিডার অন্তরাকে ফোন করে জানালাম যে এবার সিলেটেও মেহেদির জাদু চলবে ইনশাআল্লাহ। যোগাযোগ করলাম আমার কিছু স্কুলের বন্ধুর সাথে, যারা এর আগে কখনও কমিউনিটি অ্যাকশনের হয়ে কাজ করেনি। আমি ভাবতেও পারিনি যে তাদের বলামাত্রই (কয়েকজনকে তো না বলতেই!) এমন মহাউৎসাহে রাজি হয়ে যাবে।

অ্যাকশনের দুই দিন আগে আমরা লোকেশন ঠিক করে আসলাম – সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা মাছিমপুর বস্তি। বস্তি হলেও আমরা জায়গাটার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলাম। তথাকথিত বস্তির মতো ঘিঞ্জি নয়; যথেষ্ট সবুজ আর খোলামেলা। ঠিক হল, নির্ধারিত দিন (২৯ আগস্ট) আমরা সবাই এক হবো শান্তার বাসায়, সেখান থেকে মাছিমপুর।

আমি আমার বান্ধবী রাইসাকে তার বাসা থেকে নিয়ে শান্তার বাসায় যাবো। রাইসার বাসায় গিয়ে হঠাৎ মনে পড়ল, বাচ্চাদের জন্য কেনা চকলেটের প্যাকেট আমি বাসায়ই ফেলে এসেছি! আবার ছুটলাম আমার বাসায় চকলেট আনতে।

যাই হোক, শান্তার বাসা থেকে আমরা দুপুর ২টায় পৌঁছালাম মাছিমপুর। সদাবৃষ্টিস্নাত সিলেটে অস্বাভাবিকভাবে সেদিন প্রচণ্ড গরম, তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেই প্রখর রোদকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে আমরা ১০জন অ্যাকশনিয়ার আমাদের অ্যাকশনের শুভ সূচনা করলাম। :-)

“অ্যাই বাবু, মেন্দি লাগাবা?” বলামাত্র বাচ্চাগুলো এক সেকেণ্ডও চিন্তা না করে চোখ-মুখ উজ্জ্বল করে উপরে-নিচে জোরে জোরে মাথা নাড়তে শুরু করে। আমরা কারা, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি – এসব কোন ব্যাপারই না! এক পিচ্চি খুব খাতির করে আমাদের নিয়ে যায় তার কুঁড়েঘরে; বারান্দায় মোড়া পেতে দিয়ে আমাদের বসায়। আমরা সেখানে বসেই আমাদের কাজ শুরু করি। আস্তে আস্তে খবর পেয়ে অন্যান্য ঘরের বাচ্চারা এসে উঠোনে ভিড় করে। একজন তো মহা উৎসাহে তার পোষা কুকুর ‘টমি’কেও নিয়ে আসে, যদি তাকেও মেহেদি লাগানো যায়! কিন্তু কয়েকজন অ্যাকশনিয়ারের ভয়ানকরকম কুকুরভীতি থাকায় দুর্ভাগ্যবশত টমিকে বিদায় করতে হয়। :-(

মেহেদি লাগাতে লাগাতে হঠাৎ করে আমার মাথায় আবার বাজ পড়ে! আমি আবারও চকলেটের প্যাকেট ভুলে ফেলে এসেছি, এবার শান্তার বাসায়! সহকর্মীদের চোখরাঙ্গানি সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করার ভান করে এরিয়া লিডারসুলভ ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে আদেশ দিলাম, “অ্যাই, যাও তো কেউ একজন গিয়ে চকলেটগুলো নিয়ে এসো শান্তার বাসা থেকে!” (হেহেহে… :P)

এদিকে অ্যাকশনিয়ার মায়িশা খুব মন দিয়ে মেহেদি লাগাচ্ছিল আর বাচ্চাদের সাথে টুকটাক গল্প করছিল। হঠাৎ তার জামা কেমন যেন ভেজা ভেজা লাগে! মেহেদির জাদুতে শিল্পী ও তার খদ্দের দু’জন এতোই মুগ্ধ ছিল যে কখন কোন পিচ্চি শিল্পীর গায়ে প্রাকৃতিক কাজ সেরে চলে গেছে, কেউই বলতে পারে না!!!

অতঃপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে গেলাম মাছিমপুর প্রাইমারী স্কুলের মাঠে। সেখানে গিয়ে তো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ! দিগবিদিক থেকে শত শত বাচ্চা ছুটে আসছে! একে তো রোজা, তারওপর গরমে, ভিড়ে আর ধাক্কাধাক্কিতে আমাদের তখন নাজেহাল অবস্থা! গোদের ওপর বিষফোঁড়া, এমন সময় মেহেদির টিউবগুলোও গেছে ব্লক হয়ে। অনেক চেষ্টা করেও মেহেদি বের করা যাচ্ছে না। কীভাবে যে সে যাত্রা সবাইকে খুশি করে দিয়ে আসতে পেরেছি এক আল্লাহই জানেন।

সবশেষে গ্রুপ ছবি তোলার পালা। ফ্রেমে যতোজনকে জড়ো করা সম্ভব, সবাইকে নিয়ে ছবি তোলা হলো। তারা দু’হাত উপরে তুলে একস্বরে চিৎকার করে বলল, “ঈঈঈঈদ মোবারঅঅঅক!!!!” জীবনে অনেক ঈদ কাটিয়েছি, কিন্তু কখনও “ঈদ মোবারক” কথাটি শুনে এতোটা তৃপ্তি, এতোটা শান্তি পাইনি। :-)

 

ফিরে আসার সময় একটা ছোট মেয়ে পেছন থেকে হাত জড়িয়ে ধরল, “আপু, কোরবানির ঈদের সময় আবার আসবেন তো?”

 

 

This entry was posted in Action: Mehndi Magic. Bookmark the permalink.

5 Responses to ছোট ছোট হাত, ছোট ছোট স্বপ্ন…

  1. Sadia Raisa says:

    একটা বাচ্চা যে এত অল্পতে খুশি হয় আমার জানা ছিল না… ছোট একটা হাতের মাঝে আঁকিবুঁকি করার পর ওদের মুখের হাসি এ ছিল অতুলনিও…অসাধারন সেই মুহুরত…এখন অধীর আগ্রহ নিয়া পরবর্তী অ্যাকশান এর অপেক্ষা করছি…ঃ)

  2. মুনতাসির বিন মোস্তফা says:

    মজা পেলাম মেহনাজ, তোমাদের স্বতস্ফুর্ত এ সব কাজ এর কথা পড়ে… এতদিন ভাবতাম তরুন পোলাপানরা কেবল নিজেদের আনন্দ নিয়েই ডুবে থাকে। তারা দেশ পরিবর্তনের কথা বলে ঠিক ই, কিন্তু নিজে থেকে সে পরিবর্তনে হাত লাগায় না। এভাবে তোমাদের মত বা আরো ভালো করে যত বেশী তরুন/তরুনী তাদের দায়ীত্ব বুঝতে শিখবে। নিজের জায়গা থেকে সাধ্যমত করে একজন দুর্বলের পাশে কখনো অর্থ বা কখনো শুধুমাত্র শ্রম দিয়ে দাড়াবে… তবে এর ফলাফল যে কি হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। তোমাদের চলার পথে আমরাও সাথে আছি।

    Muntasir
    CEO
    Be Positive (Think Positive)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *