তাগিদ “কিছু একটা করার”

জীবনে মাঝে মাঝে কিছু করার জন্য ইচ্ছার বাইরেও প্রয়োজন হয় একটা সুযোগের। আমি বিশ্বাস করি আমাদের ইচ্ছার মধ্যে সততা থাকলে সেই ইচ্ছা একদিন পূরণ হবেই! বিশেষ ধন্যবাদটা আমি সৃষ্টিকর্তা এবং বন্ধু শাদমান সাকিব আবেদিনকেই দিচ্ছি আমার ইচ্ছা পূরণ করে দেওয়ার জন্য। নাহলে কমিউনিটিঅ্যাকশান এর সাথে আদৌ পরিচিতই হতে পারতাম না! ইচ্ছা পূরণের প্রথম ধাপে পা রেখেছি ২০১৫’র অ্যাকশন: পেঁয়াজু বেগুনীতে; ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় জোনে যোগ দিয়েছি অ্যাকশনিয়ার হিসাবে। ঢাবি ইভেন্টের ৪দিন আগে আমি ধানমণ্ডি জোনেও অংশ নেই, তবে ঢাবি’র প্রস্তুতিতে পূর্ণ অংশগ্রহণ ছিল বলে সেটার অভিজ্ঞতাটা একেবারেই অন্যরকম!

২ তারিখ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জোনের প্রি-ইভেন্ট মিটিং এর সময় আমি শুধু মনে মনে ভাবছিলাম আমার ভূমিকাটা এখানে কী হতে যাচ্ছে, কতটা ভালভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবো, কতটা সুন্দর করে সবার সাথে মিশতে পারবো . . . শুধু ভাবনা নয় বলা যায় এগুলা রীতিমত আমার কাছে চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছিলো!

ডিইউ থ্রেডে আপডেট না থাকলেই বরং বুঝতে হবে কিছু একটা সমস্যা হয়ে গেছে!

ডিইউ থ্রেডে আপডেট না থাকলেই বরং বুঝতে হবে কিছু একটা সমস্যা হয়ে গেছে!

“মিশতে পারার” প্রসঙ্গে বিরাট কৃতিত্ব নিয়ে যাবে জুকারবার্গের ফেসবুক– যে থ্রেডে যেখানে আগে কথাই হতোনা সেই থ্রেডে ইভেন্টের এতদিন পর এখনও সবাই কথা বলেই যাচ্ছে! ইভেন্টের সময় তো সময়টা মাঝরাত হোক আর সেহরির পর, কিছু যায় আসে না, থ্রেডে আলাপ চলছে তো চলছেই– শুধু ইভেন্ট নিয়েই নয়, অদ্ভুত অদ্ভুত সব বিষয়ের কথা, meme আর ট্রল, কিছু বাদ যায়নি! এতটাই যে, ডিইউ থ্রেডে আপডেট না থাকলেই বরং বুঝতে হবে কিছু একটা গণ্ডগোল বেঁধেছে কোথাও!

ডিইউ ইভেন্টের ৩ দিন আগে যা যা হলঃ আম কেনা নিয়ে ফেসবুক থ্রেডে গোলটেবিল মিটিং অনুষ্ঠিত হল, কারওয়ান বাজার থেকে বিভোর আসিফকে সদরঘাটের আমের আড়তে রীতিমত টেনে নিয়ে গেল, কম দরে আম কিনে বিজয়ের বেশে সেগুলো আজিমপুরে তাহিরা আপুর বাসায় মহাসমাগম করা হল, আম নিয়ে তুমুল গবেষণা শেষে সংরক্ষণ পর্ব হল, এবং কথা অনুযায়ী সুস্মিতাপু মানে আমাকে বীরের খেতাব দেওয়া পর্ব হল — অতঃপর থ্রেডে এগুলো নিয়ে সবার আরও এক চোট হাসাহাসি পর্ব হয়ে গেল :D

বল বীর, বল উন্নত মম আম!

বল বীর, বল উন্নত মম আম!

সেদিনই (৮ তারিখ) ধানমণ্ডি জোনের ইভেন্টের জন্যও বাজার করার শিডিউল। আজিমপুর থেকে সরাসরি নিউ মার্কেটে চলে গেলাম। আমি যেহেতু ধানমণ্ডি জোনের প্রি-ইভেন্ট মিটিং এ ছিলাম না তাই সেদিনই সবার সাথে পরিচিত হলাম। তুমুল বৃষ্টি, কাদা আর দোকানদারদের সাথে দর কষাকষি– এই ৩ বিভীষিকার সাথে যুদ্ধ করে আমরা সবাই মিলে বাজার করে ফেললাম! পরের দিন ধানমণ্ডি জোনের ইভেন্ট ডেট ছিল, সময়মত সবাই মিলে জড়ো হলাম আসরারল্যান্ডে। আসরারল্যান্ড কমিউনিটিঅ্যাকশন সার্কেলে রীতিমত বিখ্যাত জায়গা, আসরার নামক এই অ্যাকশনিয়ারের বাড়ির বেজমেন্টে বিশাল বিশাল সব ইভেন্টের গোছগাছ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে, কয়েক টন শীতবস্ত্র সর্টিং করা থেকে ইফতারের প্রস্তুতি, সব! :D সেখানকার দৃশ্য ছিল এরকম– পুনঃপরিচয় পর্ব . . . জামার হাতা গুটিয়ে কাজে নেমে যাওয়া পর্ব . . . দ্রুত গতিতে কাজ শেষ করে সবার সাথে আড্ডা দেওয়া পর্ব . . . বাদ যায়নি লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশানও!

৪টি এতিমখানার শিশু ও শ’দেড়েক পথশিশু মিলিয়ে ৪৩০ জন বাচ্চার সাথে আমরা ইফতারের আনন্দ ভাগ করে নিলাম। তাসিয়া আপু চমৎকার নেতৃত্বে আমাদের মেয়েদের গ্রুপটি মিফতাহউল জান্নাতে মাদ্রাসায় সবকিছু সুন্দর ভাবে গুছিয়ে নিই, তারপর সবার সাথে ইফতার করতে বসি। শুধু আমরাই কাজ করিনি, আমাদের সাথে কাজ করেছে মাদ্রাসার বাচ্চাগুলোও! প্রবেশের সময় বাচ্চাদের লম্বা সালাম পেলাম, আর আসার সময় পেলাম হীরের মত হাসির টুকরো। আলাদা করে নাম নিতে গেলে হয়তো আমাকে পুরো ১ পৃষ্ঠা ভরে লিখতে হবে। ধানমণ্ডি জোনের উৎসাহী, পরিশ্রমী, আন্তরিক প্রতিটা সদস্যকে এতটা সুন্দর টিমওয়ার্ক আর সুন্দর মুহূর্তগুলোর জন্য ধন্যবাদ জানাই!

3

শুধু আমরাই কাজ করিনি, আমাদের সাথে হাত লাগিয়েছে মিফতাহউল জান্নাত মাদ্রাসার বাচ্চারাও!

১০তারিখ ডিইউ’র বাজার পর্ব ছিল, সকাল ৭.৩০টায় কারওয়ান বাজারে। কিন্তু আমি পৌঁছাই ৮টায়। গিয়ে দেখি সবার বাজার করা শেষ, আমার সেদিন আর করার কিছুই ছিল না :( :P ১১ তারিখ ইভেন্টের ঠিক আগের দিন বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ি। তবু তাহিরা আপুর বাসায় সবাই জড়ো হয়ে যার যার কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নিয়ে কাজ করা শুরু করে দিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম প্যাকেজিং কমপ্লিট করে চলে যাব। প্যাকেজিং শেষ হল, ভাবলাম সেগুলো না হয় মাদ্রাসায় পৌঁছেই দেয়া যাক। ততক্ষণে তাহিরা আপুর যত্নের কারণে আমি একটু সুস্থ হয়ে যাই! মাদ্রাসায় যাওয়ার পর চিন্তা করলাম, ধুরো, সব কাজ করেই না হয় বাসায় যাই :D দুটি এতিমখানা আর পথশিশু সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ বাচ্চার সাথে আমরা আমাদের ইফতার আর হাসি ভাগাভাগি করে নেই।

Bring it on broh! B|

Bring it on broh! B|

কিছু কথা বলতেই হয় . . . শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে অভিজ্ঞতাটা পেলাম আমি জানি সেটা আমার জন্য বিশেষ কিছু, কারণ কোন সংস্থার সাথে জড়িত হয়ে টিমওয়ার্ক করার অভিজ্ঞতা এটাই প্রথম। ধন্যবাদ আমাকে যত্ন এবং ভালোবাসা দেওয়ার জন্য তাহিরা আপু এবং উনার মাকে, ধন্যবাদ ছোট ভাই-বোন ফারিহা, বিভোর, পাভেল, আবির, আসিফ, তাহসিন, সাবাবকে, আমাকে এক গাদা আনন্দের মুহূর্ত উপহার দেওয়ার জন্যে! আমার নিমন্ত্রণ পাওয়া মাত্রই অ্যাকশনে যোগ দেওয়ার জন্য মাহবুবাকে ধন্যবাদ। ফজলে রাব্বি ভাইয়া, তাসিয়া আপু, নায়েল, বিভোর, অন্তরা দিদি, রাইয়্যান আবদুল বাতেন ভাইয়া– আপনাদের ক্ষেত্রে কমিউনিটিঅ্যাকশন এর ৩ টি শব্দ “মোরাল, প্রফেশনাল, ইনফ্লুয়েনশিয়াল” খুব চমৎকারভাবে প্রযোজ্য। অনুসূয়া তোর প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা রইল, তোর সাথে আমাদের “ভাই-ভাই” টাইপের মজার সম্পর্ক আর আপনি-তুই সম্পর্ক কিভাবে যেন হয়ে গেলো :D আর ধন্যবাদ তাদের কে যারা অর্থ দিয়ে, অনুপ্রেরণা দিয়ে আমাদের পাশে থেকেছেন।

এপিবি নিয়ে যা বলবোঃ মিটিং-বাজার-প্যাকেজিং-ইফতার-অনেক রকমের সম্পর্ক পাওয়ার পাশাপাশি বাচ্চাদের কাছ থেকে দোয়া-ভালোবাসা পাওয়া, পাওয়া-না পাওয়ার ভিড়ে হাসিমুখ নিয়ে বাচ্চাদের বেঁচে থাকা, ওদের স্বপ্নের গল্পগুলো শুনতে পাওয়া, নিজের জীবনকে আর নিজের জীবনবোধকে অন্যভাবে বুঝতে পারার সুযোগে নাম-ই হচ্ছে এপিবি। কিছু অভিজ্ঞতা সার্টিফিকেটের থেকেও উঁচু দরের . . . ওগুলো শুধু এপিবির মতো কাজের মাধ্যমেই পাওয়া যায়! স্যার সলিমুল্লাহ মাদ্রাসায় মানসিক প্রতিবন্ধী নিপা আপুর সাথে পরিচিত হলাম। প্রতিটা কথার সাথে উনার মুখে হাসি লেগেই থাকে! পরিচিত হয়ে বুঝলাম আমি অনেক আরাম-আয়েশে বাবা-মা সবকিছু নিয়ে জীবন কাটাচ্ছি। কিন্তু উনার মতো করে এতো সুন্দর মন খোলা হাসি আমিও দেইনি। যাওয়ার সময় উনাকে বলে এসেছিলাম, আপু, আপনার হাসি অনেক সুন্দর, আমরা সবাই হাসতে ভুলে যাচ্ছি। আপনি প্লিজ কখনো হাসতে ভুলে যাবেন না, আর দোয়া করবেন আমরাও আপনার মতো করে সুন্দর মন খুলে হাসতে শিখে যাই!

আর মিফতাহউল জান্নাতের মেয়েদের কে বলেছিলাম, আমরা যেন সবাই সবাই ভালো থাকি, সবার সাথে ভালো থাকি– সেই দোয়াটাই যেন সবসময় করি!

পিঁয়াজু বেগুনী ডিইউ জোন!

পিঁয়াজু বেগুনী ডিইউ জোন!

নিপা আপু আর বাচ্চারা হয়তো আমাদের চেহারাগুলো মনে রাখতে পারবেনা, কিন্তু আমাদের জন্য ঠিক-ই দোয়া করবে, আমি নিশ্চিত জানি!

This entry was posted in Action: Piyaju-Beguni. Bookmark the permalink.

2 Responses to তাগিদ “কিছু একটা করার”

  1. সিফ says:

    এই প্রথমই APB দিয়ে Community Action এর সাথে আমার পরিচয়। এবং আমার মনের সব কথাগুলোই লিখে দিলেন :P

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *